তারেক রহমান এর ৩১ দফা: একটি টেকসই বাংলাদেশের স্বপ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
-
প্রকাশিত : ২৩ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
[2:07 PM, 8/22/2025] Jashim Vai Bela Barta: তারেক রহমান এর ৩১ দফা: একটি টেকসই বাংলাদেশের স্বপ্ন
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
গত ১৩ জুলাই ২০২৩ তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান কর্তৃক জাতির সামনে উপস্থাপিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা কেবল একটি রাজনৈতিক ইশতেহার নয়, বরং একটি গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক পুনর্গঠনের একটি কাঠামোগত প্রস্তাবনা। এই রূপরেখা দলটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা, যা জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা কর্মসূচি এবং বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০-এর আলোকে প্রণীত ও পরিমার্জিত হয়েছে। ৩১ দফার মধ্যে ১৫তম দফাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দফায় একটি 'অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন' গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার লক্ষ্য মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এর আলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সুষম বন্টনে…
[2:07 PM, 8/22/2025] Jashim Vai Bela Barta: দাঁড়িয়েছে, যা একটি উচ্চ বৈষম্যপূর্ণ দেশের ইঙ্গিত দেয়। তবে, আয় বৈষম্যের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সম্পদ বৈষম্য। একই সময়ে সম্পদ বৈষম্যের জিনি সহগ ০.৮২ থেকে বেড়ে ০.৮৪ হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি একটি গুরুতর কাঠামোগত সমস্যাকে নির্দেশ করে। এটি কেবল বর্তমান আয়ের অসম বন্টন নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট সম্পদের মাত্র পাঁচ শতাংশের মালিক। এর বিপরীতে, দেশের ১ শতাংশ মানুষের হাতেই মোট সম্পদের ১৬.৭ শতাংশ কুক্ষিগত। এই অসাম্যের মূল কারণ হলো সম্পদের অসম বন্টন, বিশেষ করে জমি ও স্থাবর সম্পত্তিতে, যা ধনীরা নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে।
বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ-এক্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়, যেখানে প্রতি বছর ১৪.৩ শতাংশ হারে এই সংখ্যা বেড়েছে। অথচ, আন্তর্জাতিক বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় বাংলাদেশের ধনীদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। এই স্ববিরোধী চিত্রটি অর্থ পাচার, কর ফাঁকি এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের ইঙ্গিত দেয়। একটি অর্থনেতিক ব্যবস্থা, যেখানে অতি ধনীরা রাষ্ট্রীয় আর্থিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের সম্পদ বিদেশে পাচার করে, তা মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র 'সাম্য' ও 'সামাজিক ন্যায়বিচার'কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।
আর্থিক খাতের 'কৃষ্ণগহ্বর' ও চলমান সংকট
আয় ও সম্পদ বৈষম্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের আর্থিক খাতও এক গভীর সংকটে জর্জরিত, যা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে আর্থিক খাতের ভঙ্গুর অবস্থা উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্বয়ং মন্তব্য করেছেন যে, ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় দেশের ব্যাংকিং খাত "একটি খাদের কিনারে" দাঁড়িয়ে ছিল।
অর্থনীতিবিদদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত একটি শ্বেতপত্র এই খাতকে একটি "কৃষ্ণগহ্বর" (black hole) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফল নয়, বরং রাজনৈতিক পচনের সরাসরি প্রতিফলন বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে আটটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তারা রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহায়তায় ব্যাংক লুটপাট করতে সক্ষম হয়। এই কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোও চাপের মুখে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন: সাফল্যের রূপরেখা
বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রস্তুত জাতির জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কিছু দেশ সফলভাবে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এই সংস্কারগুলো মিশ্র ফল বয়ে এনেছে।
[2:07 PM, 8/22/2025] Jashim Vai Bela Barta: নিউ জিল্যান্ডের 'রজারনমিক্স': দ্রুত সংস্কারের শিক্ষা
১৯৮০-এর দশকে নিউ জিল্যান্ডে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী রজার ডগলাসের নামে পরিচিত রজারনমিক্স' একটি দ্রুত ও ব্যাপক অর্থনৈতিক উদারীকরণ কর্মসূচি ছিল। এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা, যার মধ্যে ছিল উচ্চ সরকারি ঋণ ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা। রজারনমিক্স-এর অধীনে সরকারের প্রধান পদক্ষেপগুলো ছিল: আর্থিক বাজারকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারীকরণ করা, এবং সরকারি ভর্তুকি ও ব্যয় কমানো। এই সংস্কারের ফলাফল ছিল মিশ্র। এটি নিউ জিল্যান্ডের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছিল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া: প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের মডেল
নিউ জিল্যান্ডের অভিজ্ঞতার বিপরীতে, কিছু দেশ আর্থিক সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানিক মডেল গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। ১৯৩০-এর দশকে চরম আর্থিক সংকটের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংকিং অ্যাক্ট অব ১৯৩৫আইনটি প্রণীত হয়। এই আইনের মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের ক্ষমতা কেন্দ্রীয়ভাবে বোর্ড অব গভর্নরসের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং এফডিআইসি (Federal Deposit Insurance Corporation) নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা ফিরে আসে এবং আর্থিক ব্যবস্থার সুশাসন নিশ্চিত হয়। একইভাবে, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশন (FSC) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কমিশনটি আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও তদারকির ক্ষমতা অর্থমন্ত্রণালয় থেকে নিজের হাতে তুলে নেয়। এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যাংকগুলোকে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য জবাবদিহি করা।
এই দুটি উদাহরণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, একটি বিপর্যস্ত আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো অপরিহার্য। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত যে গভীর সংকটে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য জনাব তারেক রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিশনকে অবশ্যই এমন একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে, যা কেবল পরামর্শ দেবে না, বরং বাস্তব রূপরেখা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।
সংস্কারের পথে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশমালা
অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাবনাটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই শক্তিশালী সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠী, যারা ব্যাংক ঋণখেলাপি ও কর ফাঁকি দিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। এই গোষ্ঠী শুধু আর্থিক খাত নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও তাদের প্রভাব বিস্তার করে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোও এর মধ্যেই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বের অভাব এবং এগুলোকে একটি নির্বাচিত সরকারের বদলে একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা।
[2:07 PM, 8/22/2025] Jashim Vai Bela Barta: সুপারিশমালা: একটি কার্যকর কমিশনের রূপরেখা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জনাব তারেক রহমান প্রস্তাবিত কমিশনকে একটি কার্যকর রূপরেখা অনুসরণ করতে হবে, যা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকেও নিশ্চিত করবে। এর জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
১. আর্থিক খাতের সুশাসন: কমিশনের প্রধান কাজ হওয়া উচিত অর্থ পাচার ও ঋণখেলাপির মাধ্যমে লুট হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
২. কর ব্যবস্থার সংস্কার: করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে সরিয়ে উচ্চবিত্তদের ওপর
চাপানো জরুরি। করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনে দুর্নীতি নির্মূল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং জনগণের কাছে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে।
৩. সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ: নিউ জিল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, সংস্কারের
ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ যাতে নতুন সংকটের শিকার না হয়, সেজন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা অপরিহার্য। এটি কেবল অর্থনৈতিক বিবেচনাই নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র 'সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার'-এর সরাসরি বাস্তবায়ন।
এই পরিবর্তন কোনো জাদু বা ম্যাজিক নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং একটি সংস্কারের মনমানসিকতা। একটি জাতিকে তার গভীরতম সংকট থেকে উদ্ধার করতে হলে কেবল নীতির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সর্বস্তরের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। একটি কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে, যদি মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এর পথে সত্যিকার অর্থে হাঁটা সম্ভব হয়, তবেই একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন সত্যি হবে। এবং জনাব তারেক রহমানের হাত ধরেই এই সংস্কার সম্ভব হবে এটাই এ জাতির প্রত্যাশা ও বিশ্বাস।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
আপনার মতামত লিখুন :